|

Advertisement
×
বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা

এশিয়ায় দুর্যোগ বীমার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন আলোচনা

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ৫৬ বার পঠিত

এশিয়ায় দুর্যোগ বীমার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন আলোচনা

এশিয়াজুড়ে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় বীমা সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এনেছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্যোগে মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি পরিবার, ব্যবসা এবং সরকারের ওপর যে বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা সামাল দিতে এখন আরও কাঠামোবদ্ধ বীমা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট বন্যায় নেপালের সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির পুনর্গঠন ব্যয় ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা নেপালের অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান।

সমস্যাটি শুধু নেপালের নয়। সুইস রি ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর ৪২ শতাংশ বীমার আওতায় থাকলেও এশিয়ার উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে বীমা সুরক্ষার ঘাটতি অনেক বেশি। ভারতে দুর্যোগজনিত ক্ষতির মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ বীমার আওতায় রয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে জাতীয় দুর্যোগ বীমা কর্মসূচি চালুর আলোচনা কয়েক বছর ধরে চললেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পর সরকারি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিনির্ভর বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে দেওয়া হয়।

এ পরিস্থিতিতে প্যারামেট্রিক বীমা একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ব্যবস্থায় বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বা ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার মতো পূর্বনির্ধারিত সূচক নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। ভারতের নাগাল্যান্ড এ ধরনের দুর্যোগ বীমা কর্মসূচি চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও প্যারামেট্রিক বীমার আওতায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় এশিয়ার দেশগুলোতে এখন প্রশ্ন উঠছে-দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার, বীমা কোম্পানি এবং পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে টেকসই দুর্যোগ বীমা কাঠামো গড়ে তোলা গেলে ব্যক্তি ও ব্যবসার ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারের ওপরও পুনর্গঠন ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও এই আলোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি মোকাবিলায় আগাম আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর দুর্যোগ বীমা কাঠামো ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নেপাল-তিব্বত অঞ্চলে গত সপ্তাহের ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা শুধু শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটায়নি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ব কতটা অপ্রস্তুত, সেই বাস্তবতাও সামনে এনেছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে জলবায়ু দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে একটি কাঠামোবদ্ধ বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত বিপর্যয় জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষায় একটি বড় শূন্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে একটি হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ। বন্যায় সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের পুনর্গঠন ব্যয় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান।

দুর্যোগের পানি নেমে গেলেও এর অর্থনৈতিক ক্ষত দীর্ঘদিন বহন করতে হবে নেপালকে। আর এ ঘটনাই জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ব্যক্তি, ব্যবসা ও রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকি কে বহন করবে-সেই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছেই:

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। চলমান বর্ষা মৌসুমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাপপ্রবাহ ও বন্যা শুধু মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করছে না, কৃষি উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

পরিবেশবিষয়ক থিংকট্যাংক জার্মানওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন দশকে জলবায়ু ঝুঁকির কারণে ভারতে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় জলবায়ু দুর্যোগকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কমে আসছে। এটি এখন ব্যক্তি, ব্যবসা ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে।

প্যারামেট্রিক বীমা কি সমাধান:

রয়টার্সের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে প্যারামেট্রিক বীমা। এ ধরনের বীমায় প্রচলিত ব্যবস্থার মতো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য দীর্ঘ তদন্তের প্রয়োজন হয় না।

বরং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা, বাতাসের গতি বা ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার মতো পূর্বনির্ধারিত সূচক নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্য এ ধরনের রাজ্যভিত্তিক প্যারামেট্রিক দুর্যোগ বীমা কর্মসূচি চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। তবে এটি এখনো দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়নি।

বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সা ক্লাইমেটের ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক প্রধান পঙ্কজ তোমার রয়টার্সকে বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য বীমা প্রিমিয়াম অর্থায়নের একটি টেকসই ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কাঠামোবদ্ধ সমন্বয় প্রয়োজন।

প্রচলিত বীমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হলেও দুর্গম ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্যারামেট্রিক বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও নেপাল-তিব্বত বিপর্যয়ের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টিতে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। দুর্যোগের পর সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি থাকলেও ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশের জন্য কোনো কাঠামোবদ্ধ বীমা সুরক্ষা নেই।

বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার পরিবার, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও তাদের বড় অংশই আনুষ্ঠানিক বীমা ব্যবস্থার বাইরে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো-দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে শুধু সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর নির্ভর করাই কি যথেষ্ট, নাকি দুর্যোগের আগেই আর্থিক ঝুঁকি স্থানান্তরের জন্য একটি জাতীয় বীমা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন?

প্রয়োজন জাতীয় দুর্যোগ বীমা কাঠামো:

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য দুর্যোগ বীমাকে শুধু একটি বাণিজ্যিক বীমা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করলে এর ব্যাপক প্রসার সম্ভব নয়। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বড় অংশেরই বীমা প্রিমিয়াম দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত।

এ ক্ষেত্রে সরকার, বীমা কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগে একটি জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি বীমা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বীমা, বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য বন্যা বীমা এবং কৃষকদের জন্য আবহাওয়াভিত্তিক প্যারামেট্রিক বীমা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রিমিয়ামে সরকারি ভর্তুকি, দুর্যোগ ঝুঁকির তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নেপাল-তিব্বত বিপর্যয় দেখিয়েছে, একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক অভিঘাত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন দুর্যোগের তীব্রতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন দুর্যোগের পর শুধু পুনর্গঠনের অর্থ সংগ্রহের ওপর নির্ভর না করে আগেই আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

Facebook Comments Box

Posted ০৮:৪৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com